” আমি আপনাকে ভালোবাসি |খুউউউব ভলোবাসি | সেই যেদিন আপনাকে প্রথম দেখি সেদিন থেকেই আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি |প্রথম দর্শনেই প্রেম বলতে পারেন |”

হঠাৎ করে এরকম একটা কথার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না | একটু হকচকিয়ে গেলাম বৈকি | মজা করছে নাকি? মুখে বেশ খানিকটা অবিশ্বাস আর খানিকটা মজার রেশ রেখে আঁতকে উঠলাম ,”সেকি-কেন ?”

অপর পক্ষ থেকে সাবলীল গলায় উত্তর এলো ,“ভালোবাসাটা আমার অভ্যাস বলতে পারেন| নেশাও বলতে পারেন | যাকে ভালো লাগে তাকেই ভালোবেসে ফেলি | তাকে নিয়ে দিন রাত্রি ভাবি | কি করলে তার ভালো করা যায় তাই নিয়ে ভাবি |এমনকি, সে আমায় নিয়ে ভাবছে কিনা, সেটা নিয়েও ভাবি | তাকে নিয়ে নানান সুখের স্বপ্ন দেখি | শুনেছি, ভালোবাসলে নাকি এরকম সব আবেগজনিত কাজ কর্ম করে মানুষ |”

এবার আমার চমকাবার পালা | বলে কি ? মানসিক রোগী নয়তো ?একটা ছোট্ট ঢোঁক গিলে বললাম , “তাই নাকি ? তা, তুমি আমায় এতদিন ধরে ভালোবাসো আর আমিই টের পেলাম না ? এরকম আবার হয় নাকি ? “

দৃঢ় গলায় উত্তর এলো “এরকমটাই হয় |যাদের আমি ভালোবাসি, তারা নিজেরাও জানেও না বা কোনোদিন জানতেও চায় না যে আমি তাদের ভালোবাসি কিনা |অথচ আমার প্রত্যেকটা ভালোবাসার স্মৃতি আলাদা আলাদা করে ,বিভিন্ন সময়ে আমাকে, আনন্দ দেয় |প্রতিটা সম্পর্কের সুগন্ধই, আমার একা থাকার মুহূর্তগুলো সুখের করে তোলে | পথের দুধারে তো কত রকম ফুল ফুটে থাকে, দেখেছেন তো ? সবগুলো জুটিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে বেড়ালে এক সময়ে সেগুলো শুকিয়েও যায় আর পচে গন্ধও বেরোয় |তাই আমি চলার পথে যাদের যাদের ভালো লাগে ,তাদের সক্কলকেই আলাদা আলাদা করে ভালোবেসে ফেলি”

একদফা চারপাশটা দেখে নিলাম। পথচলতি কোনো মানুষ আমাদের কথাগুলো শুনছে কিনা। নাহ,সবাই যে যার নিজের জীবন নিতে ব্যস্ত। হন হন করে হেঁটে চলেছেন। আমি একাই বোধহয় এরকম একটা পাগলের পাল্লায় পড়লাম |কত কাজ এখনো বাকি আছে আমার |এখনো কয়েক জায়গায় যেতে হবে |

সে বোধহয় আমার মুখ দেখে ,মনের ভাব বুঝতে পারলো |বললে,’কি ভাবছেন ? ভাবছেন তো, আমি পাগল? |আসলে কেউ আমায় নিয়ে কি ভাবছে সেটা নিয়েও আমার খুব একটা মাথা ব্যাথা নেই |কেউ আমায় ভালোবাসলো কি বাসলো না ,কেন বাসলো না ,এসব নিয়ে আমি, খুব একটা ভাবি না |”

অবাক চোখে প্রশ্ন করলাম “কিন্তু এরকম একতরফা ভালোবেসে তোমার লাভ কি ?”

কাঁধটা অবজ্ঞাসূচক ভাবে একটু তুলে সে বললো , “আমি তো ভালোবেসে শুধু দিতেই চাই | তাহলে লাভক্ষতির অংক কষে আমার কাজ কি বলুন? লাভের আশা না থাকলে তো লোকসান নিয়েও মাথব্যাথা থাকে না | তাছাড়া অংকেও, আমি বরাবরই কাঁচা | ওসব যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ কোনোদিনই আমার মাথাতে ঢোকে না |আর ভালোবেসে, কি পেলাম আর কি দিলাম সে হিসেব কষা তো, আমার অন্তত সাধ্যের বাইরে |”

আমি আরও একবার বোঝাবার মরিয়া চেষ্টা করলাম ,”কিন্তু এরকম যাকে তাকে যখন তখন একতরফা ভালোবাসা তো তোমার অধিকার হতে পারে না | অন্য পক্ষের ও তো একটা মতামত থাকতেই পারে | আর সেটাও তো তোমার জানা দরকার “

” মোটেও দরকার নয় | আমি শুধু বুঝি, যার জীবনে ভালোবাসা নেই সে নেহাতই অভাগা |তার চেয়ে একতরফা ভালোবাসা অনেক ভালো|আর ,একতরফা ভালোবাসাটা আমি মোটামুটি আমার অধিকার বলেই মনে করি বলতে পারেন |নিঃশর্ত ,নিস্কাম ,অপ্রাপ্তির আলোআঁধারীর মেঘে ঢাকা | সুন্দর একটা নেশাচ্ছন্ন আবেশ | “বলতে বলতেই সে নিজের মধ্যেই যেন হারিয়ে গেল|

কি করে বোঝাই একে যে ভালোবাসা হলো এক মায়াজাল ,মাকড়সার জালের মতোই আঠালো। একবার যার গায়ে লাগে তার রেহাই পাওয়া বড় শক্ত। অনেকটা, মাছের জালে পড়ার মতো অবস্থা হয় তার।

মুখে বললাম ,”কিন্তু ভালোবাসায়, অজান্তে একটা বন্ধন তো গড়েই ওঠে |”

উত্তরটা বোধহয় মুখের গোড়াতে তৈরিই ছিল | সে সপাটে বলে উঠলো, “ ….আর ,কাউকে বাঁধতে গেলেই দুঃখ অবশম্ভাবী |একতরফা ভালোবাসায়, বন্ধনের সেই সব দুঃখগুলো নেই |ভালোবাসার মানুষকে দুঃখ দেবার চেয়ে ,না পাওয়ার দুঃখ বুকে বেঁধে বেঁচে থাকা অনেক ভালো, তাই নয় কি?”

ছোট মুখে বড় কথা মনে হলো | তবু সহানুভূতির স্বরেই বললাম ,”ভাবনাটা মহৎ সন্দেহ নেই | কিন্তু এরকম ভালোবেসে তো তুমি জীবনেও সুখী হতে পারবে না|”

চোরেদের ও নিজের কাজের সপক্ষে যুক্তি থাকে | এর তো থাকবেই | বললে ,”সবাই তো ভালোবেসে সুখী হতে চায় আর সেটাই তাদের দুঃখের কারণ হয়ে যায়| তাই একতরফা ভালোবাসে আমি বেশ সুখেই থাকি|যেটা একান্তভাবেই আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত , তার দায়ভার আমি অন্য কাউকে দিতেও চাই না |”

আমি হতাশ হয়ে বললাম ,” নাহ তোমার ভবিষ্যৎ দেখছি সত্যি অন্ধকার |”

আশায় উজ্জ্বল ওর চোখটায় তখন গভীর প্রত্যয় “ আমি জানি যে আমার পারস্পরিকতা বিহীন ,প্রতিদান বিহীন ,বিনিময়হীন ভালোবাসার কোনো ভবিষ্যৎ নেই |নাই বা রইলো ভবিষ্যৎ| বর্তমানের সুখটাতো আছে |”

ওর চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে এবার সত্যি অবাক হলাম |জানতে চাইলাম ,”কিন্তু ভালোবেসে ভালোবাসা পেতে, তোমার ইচ্ছে করে না ?”

আবার সেই নিস্পৃহ গলার উত্তর এলো “আমার তো মনে হয় ভালোবাসা কোনো বাণিজ্য নয় | যে, এতটা দিলে তবেই এতটা দিতে হবে |আচ্ছা বলুন তো,দুজন মানুষ পরস্পরকে ভালোবেসেই কি সুখী হয় ? যে থাকার নয় সেতো কোনোদিনই থাকে না |তাকে ধরে রাখার মিথ্যে চেষ্টা কি শুধু শুধু কষ্ট বাড়ায় না?”

কি আর বলি ?শেষবারের মত একটা মরিয়া চেষ্টা করলাম ,” তাহলে তোমার মতে বাস্তবে আমরা যাদের ভালোবাসতে দেখি, তাদের মধ্যে ভালোবাসার কোনো অস্বিত্বই নেই বলছো ?”

“ভালোবাসাতো কেবল মনের একটা অনুভূতি মাত্র | বাস্তবে তার কোনো চেহারা নেই |তাকে আপনি দেখবেন কি করে ? বাস্তব তো কঠিন জড়বস্তু নিয়ে সাজানো একটা দুনিয়া ,যা চোখে দেখা যায়, ছোঁয়া যায় | “

এবার আমি সত্যি সত্যিই হাল ছেড়ে দিলাম |বুঝলাম ও ওর নিজস্ব ধ্যান ধারণা থেকে এক চুলও সরবেনা | ওকে বোঝাতে যাওয়ার ঝকমারি অনেক | আমারও দেরি হয়ে যাচ্ছে | থাক না ও নিজের ধ্যানধারণা নিয়ে | কারো ক্ষতি তো করছে না | লোককে নিঃস্বার্থ ভালোবাসতে চাইছে|বাসুক না| ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিয়ে বললাম ,” আমি আজ বরঞ্চ এগোই | আমার একটু জরুরি কাজ আছে “

সে হো হো করে হেসে উঠলো বললে ,” আমি জানতাম আপনি এরকমই করবেন |এক্ষুনি,আপনিও আমায় ছেড়ে চলে যাবেন, আর আমি বোকার মতো চেয়ে চেয়ে দেখবো |এটাই বাস্তব |কারণ একতরফা ভালোবাসায় আর কিছু থাক বা না থাক একাকিত্ব আছে ,একথা অস্বীকার করে তো লাভ নেই |”

Author

  • সাহিত্যচর্চার বয়স প্রায় ৫৭ বছর।
    মূলত দুই বাংলার কবি হিসেবেই পরিচিত।
    প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ ২০ টি।
    ওপার বাংলার বিভিন্ন পত্র পত্রিকা সহ, এপার বাংলার আনন্দবাজার, দেশ, পূবের কলম, দিন দর্পণ, নতুন গতি, শুকতারা সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
    পুরস্কৃত " নব সাহিত্য কমল পত্রিকা " র প্রধান সম্পাদক ও একইসঙ্গে লিটিল ম্যাগাজিন ফোরামের ও সম্মানিত সম্পাদক।
    এছাড়াও এদেশ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও সংগঠনের সাম্মানিক পদে মনোনীত। বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মান ইতিমধ্যেই তার ঝুলিতে আছে।


Discover more from Tramlineweb

Subscribe to get the latest posts sent to your email.