ট্রামলাইনের তরফে দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সদ্য নির্মিত ছবি ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ নিয়ে সোজাসাপ্টা কথা বললেন সুমন মুখোপাধ্যায়।

দেবর্ষি: আপনার পরিচালিত সাম্প্রতিক ছবি ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ বিশ্ব মানচিত্রে অনেকদিন পর বাংলা ছবিকে তুলে ধরল আবার। রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে খুবই সম্মানিত হল এ ছবি। আমরা সেখানকার অভিজ্ঞতা কিছুই জানি না। যদি বলেন?
সুমন মুখোপাধ্যায়: হ্যাঁ, রটারডাম ফেস্টিভ্যালের নির্বাচক মন্ডলী ছবিটা নির্বাচন করে জানান। অবশ্যই, ওঁদের ভালো লেগেছে বলেই ওরা জানিয়েছেন। আমি বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, যাঁরা ভারতীয় নন, তাঁরা ছবিটা কীভাবে দেখবেন! ছবিটার অবশ্যই একটা ভিশুয়াল কোয়ালিটি আছে, ঐতিহাসিক দিক আছে, বলা যেতে পারে পিরিয়ড পিস এক রকমের এছবি। এবং যে জটিল আবর্ত এ উপন্যাসের মূল চরিত্র শশীর মধ্যে, এবং তাঁর সঙ্গে যে চরিত্রগুলো রয়েছে, তাদেরকেই বা কীভাবে ওঁরা নেবেন- সেটা প্রথম স্ক্রিনিং পর্যন্ত বুঝতে পারছিলাম না। শশী ছাড়াও এ উপন্যাসের অন্যতম জরুরি চরিত্র কুসুম, কুমুদ বা যাদব পণ্ডিতরা। ভাবছিলাম, বাংলা ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যের যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব, তা পেরিয়ে এ উপন্যাসের নুয়ান্সেসগুলো লোকে ধরতে পারবে কি না!
রটারডাম সারা দুনিয়াতেই খুব জরুরি ও মান্য সিনেমা ফেস্টিভ্যাল। দুনিয়ার অন্যতম সিরিয়াস ফেস্টিভ্যাল হিসেবেই এর নাম রয়েছে। আমাদের সেখানে ৪টি স্ক্রিনিং ছিল। আমার মনে পড়ছে, মাত্র ৬জন ভারতীয়কে আমি দেখেছিলাম সেখানে। বাকি সব ইউরোপীয়রাই এসছিলেন ছবিটি দেখতে। বা, সেকেন্ড জেনারেশান ভারতীয়দের বাবা-মা এসেছিলেন ছবিটি দেখতে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, সংযোগহীনতা যেন না তৈরি হয়। যেহেতু আমার ছবিটি ভারতবর্ষ থেকে গেছে, পরিয়ড ছবি। তাই সমাজের আধুনিক পারিপার্শ্বিক জায়গা থেকে ছবিটা পাঠ করা যাচ্ছে কি না, সেটাই দেখার। সে জন্যেই বারেবারে তারা প্রশ্ন করছে শশীকে নিয়ে। শশীর যে বারেবারে হেরে যাওয়া, তাঁর স্বপ্ন-কাজ-আশা-সম্ভাবনার যে জায়গাগুলো, গ্রাম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে কিন্তু পারছে না, অর্থাৎ এই যে অক্রিয়া থেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে যাওয়া একজন মানুষ, আধুনিক শিক্ষিত বিজ্ঞান জানা একজন সে বুঝতে পারছে নানা ব্যাধীতে আক্রান্ত গ্রাম-সেখানেও সে চেষ্টা করছে তার ভেতর যদি পরিবর্তন আনা যায়, ক্রমশ সেখানেই সে জড়িয়ে পড়ল এবং কোনও সংলাপই তৈরি করতে পারল না সমাজের সাথে, গোটা সংলাপটাই হল তাই মনোলগ, যেখানে তাঁর অনেক কিছু করার সম্ভাবনা ছিল, সামাজিক জায়গাগুলোকে ভেঙে বেরনোর কথা ছিল বরং নিজের ভেতরেই জালে জড়ালো সে। এই যে জায়গাটা, এটাই আমাকে এ ছবি করতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে, একটি ভারতীয় ছেলে যে অনেকদিন আগে স্বদেশ থেকে দূরে ডাচ হিসেবেই বড় হয়েছে, সে ছবিটা দেখে এসে বলল, শশীর এলিয়েনেশানকে ধরতে পেরেছে এক ভাবে। এ ছাড়া যাদব পন্ডিতের স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে দার্শনিক প্রশ্ন বা ছবির প্রযুক্তিগত দিক বা অভিনয় নিয়েও অনেকে প্রশ্ন করেছেন। ছবির ছন্দ, এস্থেটিক গুণ নিয়েও কথা হয়েছে। এ চলচ্চিত্রের ভাষা ও উদ্দেশ্য তাই এক ধরনের মানুষের কাছে পৌঁছেছে। কিন্তু এখানকার মানুষ কি বলবেন, তার দিকে তাকিয়ে আছি। তবে রটারডাম যেহেতু অন্যতম সিরিয়াস চলচ্চিত্রচর্চার জায়গা ও পরিচালকদের মধ্যের কথাবার্তার জায়গা, ফলে সেখানে এ ছবির প্রশংসা নি:সন্দেহে আমাকে জোর দিয়েছে।
দেবর্ষি: ইন্টেলেকচুয়াল ব্যাংরাপ্সি-এই শব্দবন্ধ আপনি নানা লেখায় ব্যবহার করেছেন সম্প্রতি। বলেছেন, এই জায়গা থেকেই এই উপন্যাস আপনাকে টেনেছে। কারণ সমকালের এই যে বুদ্ধিজীবীদের হেরো অবস্থা, সে বিষয়টির উল্লেখ আপনি আপনার প্রথম বইয়েও করেছেন। তো, বিদেশে এ ছবির এই যে প্রভূত সম্মান, তার নেপথ্যে কাজ করে গিয়েছে আপনার এই সত্য বচন? উল্লেখ থাক, শশীও একজন ডাক্তার এবং গত বছর ডাক্তাররা মিলেই একটি আন্দোলন করলেন আর জি কর প্রসঙ্গে…
সুমন মুখোপাধ্যায়: সেটাই বলছি, শশীর আটকে পড়াটা এ সময়ের ক্রাইসিস। এ উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়েছিলেন বাবা। সেটি দেখেই উৎসাহ পেয়েছিলাম, এ ছবি করার। তার আগে ছাত্রাবস্থায় বারবার পড়েছি উপন্যাসটা। শিবাজিদা এ উপন্যাস নিয়ে একটা ইংরেজিতে লেখা লিখেছিলেন, যাদব পণ্ডিতকে নিয়ে। সেখানে তিনি বলছিলেন, আমরা প্রোভোক করতে পারি নতুন চিন্তাকে৷ আমাদের ভাবনা, কাজ, গতিবিধি থেকে বেরনো পথ বা স্ফুলিঙ্গ থেকে আমরা এজেন্টস অফ চেঞ্জ হতে পারি, ট্রিগার করতে পারি। শশীও সব দিক থেকেই প্রস্তুত ছিল। অর্থাৎ সে কলকাতায় যায় যখন, সেখানে সাহিত্যের বন্ধুদের সাথে মিশছে এবং মেডিক্যালের বন্ধুরা। কিন্তু যাদব পণ্ডিতের সাথে তর্ক করলেও তিনি যখন মারা গেলেন, সেখানে কি তাঁর নীরব সাক্ষী হওয়া ছাড়া কিছু করার ছিল না কি? সে কি এই ঘটনার একটা অংশ হয়ে গেলো না নীরবে? বা, আমরা যারা মনে করেছিলাম যে নতুন পথে হাঁটছি, তারপর যখন আমাদের অস্ত্রগুলো নিয়ে নিল অন্যেরা, আমরা সেই অস্ত্রে আবার ধার করে লড়ার চেষ্টা করছি। আমার এ ছবির সময় যদিও মন্বন্তর শুরু হওয়ার সময়, কিছুটা বদলেছি সময়টা। শশীর জীবনে কোনও ভুঁয়ো আশা আমি দেখাইনি। উপন্যাসটা বেরোয় ৩৬ সালে। কিন্তু আমার ছবিতে মন্বন্তর আসছে, দুর্ভিক্ষ আসছে। ইউরোপের যুদ্ধের জন্য নানা কোণে দুর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে দুনিয়ার। গ্রামে বারবার খবর আসছে এলাকার চণ্ডিমন্ডপে সে যুদ্ধের। আমি এভাবে দেখিয়েছি। আমার ক জন শিক্ষক ও বন্ধুরা ছবিটি দেখে ভালো বলেছেন।

দেবর্ষি: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা নিয়ে এর আগে কাজ করেছেন গৌতম ঘোষ৷ পদ্মানদীর মাঝি। কমলকুমার থেকে যখন তিনি করেছিলেন অন্তর্জলি যাত্রা, তখন সন্দীপন চাটুজ্যে একটা রিভিউতে লেখেন, গৌতম যা পেরেছেন, গৌতম যা পারেনি। মানিকের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ তীব্র দার্শনিক এক আখ্যান, অস্তিত্ববাদী লেখা এসব। তাকে সিনেমায় ধরা ঠিক কতটা কঠিন ছিল? যেহেতু আগে আপনি নানা সময় জটিল উপন্যাস থেকে সিনেমা বা থিয়েটার করেছেন…
সুমন মুখোপাধ্যায়: মানিকবাবুর লেখা বরাবরই কঠিন ও জটিল মনস্তাত্ত্বিকভাবেও। উপন্যাসের মধ্যেও কথকের কন্ঠ,চরিত্রের ভাবনা নানা ভাবে মিশে থাকে। ইচ্ছে করেই সে শ্লেষ বা জটিলতা রাখা আছে লেখায়। কিন্তু আমি যখন সিনেমায় ভাবছি, উপন্যাসের অত বড় বিস্তারকে ধরাটা সোজা না। হারবার্ট ছোট উপন্যাস হলেও প্রতি লাইনে এটা বারেবারেই ছিল। বরবর সামাজিক আন্দোলন যেন প্রত্যেকটা লাইনে গোঁজা, যে মলোটভ ককটেলের মতই বিস্ফোরক। যখন রবীন্দ্রনাথ করছি তখন আবার আলাদা। পুতুলনাচেও আমি চেয়েছি শশীর মনোজগতকে সিনেমাটিক ভাবে ধরতে। সেখানে মতি বা কুমুদের জীবন অত দেখাইনি। শশীর উপরেই আমি থাকতে চেয়েছি। কারণ সিনেমা আর উপন্যাস এক নয়। একটা চরিত্রের মূল ধারাটাকে যদি ধরা যায়, তারই চেষ্টা থাকে আমার। দর্শক সিনেমা দেখতে আসে, মেলাতে আসে না উপন্যাসের সাথে সিনেমাকে। তাই আমি সিনেমার ভাষাকেই গুরুত্ব দিয়েছি। ছবি হয়ে ওঠাকেই আমি গুরুত্ব দিচ্ছি, অর্থাৎ ভিশুয়াল ট্রিটমেন্ট বা প্ল্যানটাই জরুরি। এ প্রসঙ্গে বলি লিট ফেস্টে ধৃতিমানদা বলছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী উপন্যাসটাই তিনি পড়েননি, চিত্রনাট্যটাই শুধু পড়েছিলেন মন দিয়ে। সত্যজিৎবাবুও ওঁকে পড়তে বলেননি। কারণ দুটো মাধ্যম আলাদা।

দেবর্ষি: পুতুলনাচের চিত্রনাট্যটা আপনার দ্বিতীয় ছবি হিসেবে করার একটা প্ল্যান ছিল আপনি বলছিলেন। সেটা ফাইনালি এতদিন পর হচ্ছে। আপনি অবশ্য একই সময় দুটো আলাদা ধারার কাজ বারবার করেছেন, অর্থাৎ কাঙাল মালসাট আর শেষের কবিতা-আপনি একই সঙ্গে শুট করেছেন। আজও আপনি উৎপল দত্ত বা ব্রেখটের পাশেই এই আধুনিক উপন্যাসটা নিয়ে কাজ করছেন। এ উপন্যাসের কিছু প্রবাদ হওয়া লাইনের একটি ‘শরীর শরীর তোমার কি মন নাই কুসুম…’ এ লাইনগুলো কি ছবিতে দেখতে পাব আমরা?আর, এই যে এত বছর পর আবার এই উপন্যাসটা নিয়ে কাজ করছেন, আগের চিত্রনাট্য কি বদলালেন কোথাও?
সুমন মুখোপাধ্যায়: হারবার্টের পর এ উপন্যাস নিয়ে কাজের কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু মানিকবাবুর পুত্র খুব একটা উতসাহী ছিলেন না। তারপর আমি ভারত সরকারের একটা ফেলোশিপ পাই, যার সুবাদে একটা নাটক আর একটা সিনেমা করার কথা ভাবি, সে সূত্রেই ‘চতুরঙ্গ’ নিয়ে কাজ শুরু করি। আরেকটা চিত্রনাট্য ‘মধু সাধু খাঁ’ নিয়েও কাজ করার প্ল্যান থাকলেও বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে এই ছবিটা করার পরিকল্পনা ছিল বরাবরই।
দেবর্ষি: পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাস প্রসঙ্গে মানিকবাবু সন্দীপনকে বলেছিলেন, তিনি কখনওই খুব মাঝিদের সাথে মিশে এ উপন্যাস লিখেছেনে এমন নয়। পুতুলনাচ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, রোগগ্রস্ত সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এককের কথা। আপনার একাধিক সিনেমা বা থিয়েটারেও বারবার আপনি অপরের কথাই বলেছেন। তো, শশী ডাক্তারের মধ্যেও কি সেই অপরের খোঁজই আপনি চালালেন আবারও? সেও তো একটা গোটা গ্রামের রোগময়তার বিরুদ্ধে লড়ছে…
সুমন মুখোপাধ্যায়: আমার শিল্প জীবনে বারেবারেই চেষ্টা করেছি নিজের ভাষ্য ও নির্মাণ রাখতে। চেষ্টা করেছি সময়ের সঙ্গে থাকতে। তার মধ্যে কয়েকটা জিনিস হয়ত ঠিক ভাবে হয়নি, কিছু আবার ঘটেওছে। এভাবেই কেটে গেলো শিল্পী জীবনের অনেকগুলো বছর। আমার মনে হয়েছিল, শশী কি লড়াই করছে না লড়াইয়ের একটা আভাষ তাঁর মধ্যে? যাদব পণ্ডিতের মারা যাবার মুহূর্তে শশী যদি বলত এই মৃত্যু আফিমের জন্য। অন্য কোনও কারণে না- তাহলে গ্রামের লোকেরা ওঁকে পিটিয়ে মেরে ফেলত। বা তেমনটা নাও হতে পারত। কিন্তু শশী পারেনি। জোন অফ আর্ক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, জিওরদানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল কারণ তাঁরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। গ্যালিলেও কিন্তু চার্চের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিজ্ঞানকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছিলেন। ব্রেশট সেই নিয়ে নাটক লিখেছিলেন, চেয়েছিলেন মানুষ জানুক গ্যালিলেওর এই ঐতিহাসিক ভুলের কথা। শশীকে দিয়ে কি আমরা চিনতে পারব আমাদের ভুলের কথা? আমরা কোথাও চেঁচাতে পারছি না, আমাদের পাশ দিয়ে ইতিহাস-সময়-অন্যায় সব বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা শুধু নিজেদের সাথে কথা বলে চলেছি। আমরা যারা শশীর মত নিজেদের মনে করি, তারা কি আদৌ লড়ছি? নাকি স্রেফ নিজেদের মধ্যে অবসাদগ্রস্ত আত্মকথন চালাচ্ছি। আমার যেখানে চেঁচানোর সেখানে কি চেঁচাচ্ছি? না নীরব হয়ে থাকছি?ঠিক যেভাবে শশী চেঁচাতে পারে না, এবং সমাজ এখানে খুনটা করছে কিন্তু শশী কিছু বলতে পারছে না। এই জায়গাটা খুব জরুরি।
দেবর্ষি: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার ছবির জন্য আগাম শুভেচ্ছা থাকল।
সুমন মুখোপাধ্যায়: ধন্যবাদ।
Discover more from Tramlineweb
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
