‘পুরাতন প্রসঙ্গ’ ও ‘বিচিত্র প্রসঙ্গ’-এর লেখক, সম্পাদক ও সংকলক বিপিনবিহারী গুপ্তকে রসরাজ অমৃতলাল বসু জানিয়েছিলেন, বঙ্গাব্দ ১২৬০-এর ৬ বৈশাখ (১৭ এপ্রিল ১৮৫৩), রাম নবমীর দিন তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা কৈলাশচন্দ্র বসু। পিতৃ প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে অমৃতলাল বলেছেন তাঁদের পরিবারের কথা এবং তাঁর শিক্ষালাভের কথাও। এই বসু পরিবারের আদি বাসস্থান কলকাতা নয়— তাঁরা ধলচিতার বসু। অমৃতলালের প্রপিতামহ ধলচিতা গ্রাম থেকে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন শোভাবাজারে। শোভাবাজার রাজবাড়ি, অর্থাৎ বিনয়কৃষ্ণ দেবের রাজমহলের আশেপাশেই তাঁরা বসবাস শুরু করেন। অধুনা যে-রাস্তাটা উত্তর কলকাতার খান্না সিনেমার মোড় থেক হাতিবাগান মোড় পেরিয়ে সোজা গিয়ে পড়েছে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে – সেই গ্রে স্ট্রিট (এখন নাম অরবিন্দ সরণির অস্তিত্ব ছিল না)।

Historic image of a young man with long hair and traditional attire, possibly a notable figure from Bengali literature.
অমৃতলাল বসু

   তাঁর পিতা পড়াশোনা করেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারি স্কুলে। কৈলাশচন্দ্রের সহপাঠী ছিলেন শম্ভুনাথ পণ্ডিত। অমৃতলালের মতে, মেট্রোপলিটান কলেজ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অসামান্য কীর্তি। ঠিক তেমনই শিক্ষা-প্রেমী গৌরমোহন আঢ্যর অক্ষয় কীর্তি ওরিয়েন্টাল সেমিনারি। গৌরমোহন বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ করে স্কুল পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। বাংলা ও সংস্কৃত পড়াতেন দেশীয় শিক্ষকরাই। ভালো ইংরেজি শিক্ষক সন্ধান করতে গৌরমোহন আঢ্য নৌকাযোগে গিয়েছিলেন শ্রীরামপুর মিশনে। সেখান থেকে ফেরার পথে নৌকাডুবি হয় এবং গৌরমোহন আঢ্যের অকালপ্রয়াণ। এই জন্য গৌরমোহন আঢ্য মহাশয়কে অমৃতলাল বলেছেন ‘শিক্ষাশহিদ’।

   তাঁর বাবা কৈলাশচন্দ্র বসু ইংরেজি ও বাংলায় ভালো প্রবন্ধ পড়লে লেখকদের খুঁজে বের করে অর্থসাহায্য করতেন। গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্য এমনই একজন। কৈলাশচন্দ্র বসু নিজেও ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে শিক্ষকতা করেছেন। পরে ম্যাকেন্‌জি লায়াল কোম্পানিতে চাকরি গ্রহণ করেন। অফিসের কাজের ফাঁকে তিনি মেটক্যাফ হল-এর লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতেন। অমৃতলাল প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে। সে সময় ওরিয়েন্টাল সেমিনারির প্রধান শিক্ষক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র নন্দী। ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন ফ্রেড্রিক পেনি। সেই সময়ে বাংলা ভাষার লেখকদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয় দত্ত, মাইকেল মধুসূদন, মদনমোহন তর্কালংকার প্রমুখের লেখা সাহিত্য-উৎসাহী পাঠকরা সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।

বাংলা নাটক 'ব্যাপিকা বিদায়' এর প্রচ্ছদ, যেখানে দেবী সরস্বতীর চিত্র এবং সুসজ্জিত ফ্রেম দেখা যাচ্ছে।
‘রূপকার’ প্রযোজিত ব্যাপিকা বিদায় প্রযোজনার শততম রজনীতে প্রকাশিত স্মরণিকা
(সৌজন্য – শ্রীমতী স্মিতা সিংহ)

    সেই সময়ে বিখ্যাত বটতলার বই বিক্রেতা বেনি মাধব দে-র পুত্র লালবিহারী দে তাঁর সহপাঠী ছিলেন। লালবিহারীর সূত্রেই সংকলিত হবে ‘বাংলার উপকথা’ পরবর্তীকালে। লালবিহারী দে-র সূত্রে দিনবন্ধু মিত্রের ‘লীলাবতী’ নাটক হাতে আসে অমৃতলালের। তবে তিনি স্পষ্টই বলেছেন, বঙ্গদর্শনে বিষবৃক্ষ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হওয়ার সময় থেকেই বাঙালির এবং রসরাজ অমৃতলালের হৃদয়-সম্রাট হয়ে উঠলেন ‘নভেল সম্রাট’ বঙ্কিমচন্দ্র।

একজন পুরনো কালীন পুরুষের ছবি, মাথায় স্ট্রাইপযুক্ত টুপি পরে আছেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

    ইতিমধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র ‘আয়েষার রূপ বর্ণনাচ্ছলে বটতলার সরস্বতীকে আহ্বান করে একটু বিদ্রূপ করার পর থেকে’ বহু সাহিত্যরসিক বটতলা প্রসঙ্গে কিছুটা হাসি-ঠাট্টা করতেন।

    অমৃতলালের ‘পুরাতন পঞ্জিকা’ শীর্ষক লেখায় এই উল্লেখ পাওয়া যায়। আদতে বঙ্কিমচন্দ্র আয়েষার নয়, আশমানির রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বটতলার সরস্বতীকে আহ্বান করেন। দুর্গেশ নন্দিনীর দ্বাদশ পরিচ্ছেদে বঙ্কিমচন্দ্র লেখেন— ‘হে বাগদেবী! হে কমলাসনে! শরদিন্দুনিভাননে… আমাকে সেই চরণকমলের ছায়া দান করো। আমি আশমানির রূপ বর্ণনা করিব… হে বটতলা! বিদ্যাপ্রদীপ – তৈলপ্রদায়িনী!…’

   অমৃতলাল লিখেছেন, বটতলা না থাকলে কোথায় থাকত তোমার বাংলা বিদ্যা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা ভাষা, বাংলা ধর্ম, ইত্যাদি। চোদ্দ আন্নায় সে সময় বটতলায় পাওয়া যেত রামায়ণ, মহাভারত সহ আরও নানা কিসিমের বইপত্র। যেমন ‘নিঝুম রেতে চাঁদিনী মেখে স্ফুরিত অধরে অধর ঘষিয়া চুম্বন মুদ্রিত করে ঝড়ের মতো বেগে’ বটতলা বাগবাজার থেকে বৌবাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল বটতলার বইয়ের দোকান। ‘কবিকঙ্কন চণ্ডী’, ‘মনসার ভাসান’, নানাবিধ বৈষ্ণব গ্রন্থ, কামশাস্ত্র বিষয়ক নানা বই ছড়িয়ে পড়ল কলকাতায়। ‘কি মজার শনিবার’, ‘কি মজার রবিবার’, ‘কি দুঃখের সোমবার’ প্রভৃতি চটি বই তখন বাঙালির হাতে হাতে ফিরছে। অমৃতলাল নাটক রচয়িতা হিসেবে তাঁর প্রস্তুতিপর্বে ইংরেজি ও ইওরোপীয় সাহিত্য যেমন পাঠ করেছেন, তেমনই বিদ্যাসুন্দরের আদি রস, বটতলা-প্রযোজিত ‘এক রাতের রতিক্রিয়ার বর্ণনা’ বা ‘সন্ধ্যা হইতে ভোর’ ওই একই কাজের বিস্তারিত বিবরণ জেনেছেন বটতলার দৌলতে।

   লক্ষণীয় বিষয়, প্রহসনের রচয়িতা রসরাজ অমৃতলাল বসু খুব অল্প বয়স থেকেই, যা পেয়েছেন পড়ে ফেলেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর হৃদয়-সম্রাট, দীনবন্ধু মিত্রের নাটক, মাইকেলের কাব্যের সঙ্গে জনপ্রিয় সাহিত্যও নির্মাণ করেছে অমৃতলালের মানসগঠনকে। পরবর্তীকালে মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর এবং গৈরিশ ছন্দ বিষয়ে তুলনামূলক আলোচনা আমরা পাব অমৃতলালের হাতে। তিনি ‘ব্যাপিকা বিদায়’, ‘বিবাহ বিভ্রাট’, ‘হীরক চূর্ণ’, ‘চোরের ওপর বাটপাড়ি’, ‘নবযৌবন’, ‘খাস দখল’, ‘কালাপানি’, ‘তিলতর্পণ’, ‘ব্রজলীলা’, ‘ডিশমিশ’ প্রভৃতি প্রহসনের পাশাপাশি অসাধারণ কিছু গদ্যরচনা করে গিয়েছেন, যেগুলি থেকে উনিশ শতকের কলকাতা এবং সাধারণ রঙ্গালয়ের অসাধারণ বৃত্তান্ত উত্তরকালের পাঠকের জন্যে প্রস্তুত হয়েছে।

বঙ্গীয় নাট্যকার অমৃতলাল বসুর লেখা নাটকের বই 'ব্যাপিকা বিদায়' এর প্রচ্ছদ।

    ওরিয়েন্টাল সেমিনারি থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করার পর অমৃতলাল ভর্তি হন মেডিকাল কলেজে। এখানে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে তারিণীচরণ বসু, মহেন্দ্রনাথ ঘোষ, গিরীশচন্দ্র দে এবং রাধাগোবিন্দ কর পরবর্তীকালে চিকিৎসক হিসেবে লাভ করেছিলেন খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা। মজার বিষয়, রাধাগোবিন্দ কর বা Dr. R.G. Kar থিয়েটারেও সহযাত্রী হবেন অমৃতলালের। ১৮৬৮ থেকে ১৮৭২, এই চার বছরের বৃত্তান্ত সংক্ষেপ করা হচ্ছে, কারণ ১৮৭২ এবং ঠিক তার চার বছর পর বাংলা রঙ্গালয়ে ঘটে যাবে দুটি যুগান্তকারী ঘটনা। অমৃতলাল বসু দু’বছর মেডিকাল কলেজে পড়াশোনা করে স্থির করেন, হোমিওপ্যাথি পড়বেন। তাঁর হাত ভেঙে গিয়েছিল। হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার বেরিনি প্রথম কলকাতায় হোমিওপ্যাথি সার্জারি করে ভাঙা হাত জোড়া দেন। সেই সার্জারি দেখতে উপস্থিত হয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং ডঃ রাজেন দত্ত। পাতলা পেস্ট বোর্ড দরকার হওয়ায় একজন বলেন, শেক্ষপীরের মলাট চলতে পারে। ডাক্তার বেরিনি হেসে বলেন – ‘…or the cover of the Bible may do’। চিকিৎসক সমাজের মধ্যে নিরীশ্বরবাদ সেই সময়ই যথেষ্ট প্রচলিত ছিল মনে হয়েছে অমৃতলালের। এর পর তাঁর কাশী-বাসী হওয়া। হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার লোকনাথ মৈত্রের আশ্রয় গ্রহণ করেন পরবর্তীকালের রসরাজ। লোকনাথবাবু তখন এক বিখ্যাত জজ সাহেবের স্ত্রীকে পেটের অসুখ থেকে সুস্থ করে প্রতিষ্ঠা ও যশ পান এবং তৃতীয়বার দারপরিগ্রহ করেন। তাঁর স্মৃতিতে পরবর্তীকালে অমৃতলাল লিখবেন—

        ‘কোথা তাত লোকনাথ          দেবপদে প্রণিপাত,

                কত কোথা ওঠে মনে তোমার স্মরণে।

         কত স্নেহ ভালভাসা,           কত সুখ কত আশা

               পেয়েছি পায়ের পাশে কিশোর জীবনে।।’

A historical portrait of a man seated, holding a pipe, with long hair and traditional attire, reflecting Bengali cultural aesthetics.
রসরাজ অমৃতলাল বসুর একটি দুষ্প্রাপ্য ছবি (সৌজন্য – শ্রীমতী স্মিতা সিংহ)

১৮৭২ সালের গোড়ায় লোকনাথ মৈত্রের চিঠি নিয়ে কাশির কাছে বাঁকিপুরে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার হিসেবে কাজ করতে গেলেন অমৃতলাল। সেখানে বলদেব পালিতের বাড়িতে থাকেন এবং কিছু দিনের মধ্যেই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের চিকিৎসা শুরু করেন। নিজে পৃথক একটি বাড়ি ভাড়াও করেন। বাঁকিপুরে সে সময়ে এসেছিলেন বাগ্মী কেশবচন্দ্র সেন। তাঁর বক্তৃতা শুনেও মুগ্ধ হন অমৃতলাল। কাশী এবং বাঁকিপুর পর্বেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় উপেন্দ্রনাথ দাস এবং রাজচন্দ্র সান্যালের। উপেন্দ্র তাঁর নাট্য-বান্ধব হবেন অচিরেই। আর রাজচন্দ্র ছিলেন Queen’s College-এর গ্রন্থাগারিক। তাঁর সুবাদে কলেজের প্রিন্সিপ্যাল গ্রিফিথ সাহেবের সঙ্গে পরিচয় অমৃতলালের। গ্রিফিথ নিজে অনুবাদ করতেন রামায়ণ-মহাভারত এবং অমৃতলালকে উৎসাহ দিতেন ইংরেজি ভাষায় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশের নাটক, উপন্যাস প্রভৃতি পড়তে। রাজচন্দ্র লাইব্রেরি থেকে বই দিয়ে সাহায্য করেছেন তাঁকে। এরই মধ্যে প্যারিমোহন বসুর সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তাঁর সঙ্গে গিরিশচন্দ্রের বোনের বিবাহ হয়। এই সময়ে, নানারকম প্যারডি লেখা শুরু করেন অমৃতলাল। মাইকেল লিখেছিলেন— ‘শৈবালের দলে শোভে যেই রত্নরাজি’। প্যারিমোহন লিখলেন— ‘বৃষভের ল্যাজে শোভে যেই পুচ্ছরাজি’। প্রহসন রচনার দিক থেকে ‘হীরক চূর্ণ’ অমৃতলালের গোড়ার দিকের রচনা। তখন যশোর থেকে প্রকাশিত হত অমৃতবাজার পত্রিকা। ইংরেজি কাগজে থাকত ‘comic tidbits’। অমৃতবাজারে হাস্যরসাত্মক বিবিধ প্রসঙ্গ পড়ে উত্তেজিত হয়ে আর-একটি farce লিখে বসেন অমৃতলাল। পাড়ার ছেলেরা দাবি করেছিল, ‘দাসুরায়ের পাঁচালী’ অবলম্বনে প্রহসন লিখতে। অমৃতলাল স্পষ্টই লিখেছেন— তখন সবে পড়িয়াছি মাইকেল মধুসূদনের ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’। সেই আদলে লেখা farce-টি পরবর্তীতে হারিয়ে যায়, এই তথ্যও জানিয়েছেন অমৃতলাল।

একজন পুরাতন বাঙালি ব্যক্তিত্ব যিনি সাহিত্য ও নাটকে অবদান রেখেছেন।
অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি

    স্কুলে পড়ার সময়ে অমৃতলালের সহপাঠী ছিলেন অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি। সাহেব মাস্টার মুস্তাফিকে বলতেন ‘ম্যাস্টিফ’। এই নিয়ে বাঁকি পড়ুয়ারা ‘গোল পাকাত’। অমৃতলাল তখন বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছেন বারবার। অর্ধেন্দু এর পর পাইকপাড়ার স্কুলে চলে যান। ক্রমশ অর্ধেন্দু-অমৃতলাল দুই মাথা একত্র হবেন। তাঁদের সঙ্গে জুড়ে যাবেন ধর্মদাস সুর, নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভুবনমোহন নিয়োগী। এই চার মাথার মিলনে বাংলার সাধারণ রঙ্গালয় স্থাপনের পথ প্রশস্থ হবে। ওদিকে আবার, ‘বড় দুই মাথার ঠোকাঠুকি’। দুজনেরই নামের অর্থ শিব – গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি।

   এই দুই মাথার লড়াই প্রসঙ্গে রসরাজ আমাদের নিয়ে যাবেন দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস সকাশে। সেখানে উপস্থিত কেশবচন্দ্র সেন ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। ব্রাহ্ম সমাজে কাজকর্ম নিয়ে দুজনের প্রবল তর্কাতর্কি। আর শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, রামচন্দ্র আর মহাদেবের লড়াই বেঁধেছে। এ ওঁকে বাণ মারেন, উনি তাঁকে বাণ মারেন। বাণ মেরেই পরস্পর পরস্পরকে স্তব-স্তুতি করতে থাকেন। রাম ও শিবের ঝগড়া মিটে যায় দ্রুত, কিন্তু শিবের ভুত-প্রেত আর রামচন্দ্রের বানরবাহিনীর লড়াই আর যে থামে না।

একজন পুরনো স্টাইলের পোশাকে বসে আছেন, হাতে বই রয়েছে।
গিরিশচন্দ্র ঘোষ

   গিরিশ-অর্ধেন্দুর গোলমালের অনেক কারণ ছিল। তখন প্রাইভেট থিয়েটারের যুগ। জোড়াসাঁকোয় থিয়েটার, বেলগাছিয়া পাইকপাড়ায় থিয়েটার— এসব হচ্ছে দেশীয় বাবুদের থিয়েটার। অন্যদিকে মিসেস ব্রিস্টো-র থিয়েটার, চৌরঙ্গী থিয়েটার প্রভৃতি। গিরিশচন্দ্রের বক্তব্য ছিল পেশাদার রঙ্গমঞ্চ গড়ে তুলতে গেলে পরিকাঠামো হতে হবে যথাযথ। অন্যদিকে নগেন্দ্রনাথ, অর্ধেন্দুশেখর চাইছেন টিকিট বিক্রি করে পেশাদার রঙ্গমঞ্চের পত্তন। অভিনেতা যশপ্রার্থী অমৃতলাল জুড়ে গেলেন অর্ধেন্দুশেখরদের সঙ্গে। তাঁর লেখায় একাধিকবার তিনি অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফিকে তাঁর থিয়েটারের গুরু বলে উল্লেখ করেছেন। অর্ধেন্দুশেখরের সঙ্গে যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের মামাত পিস্তুত ভাইয়ের সম্পর্ক। যতীন্দ্রমোহন ধনাঢ্য তাই মাস খরচা জোগান ভাই অর্ধেন্দুশেখরকে। যতীন্দ্রমোহন নাটক নামালেন ‘বুঝলে কি না?’ জবাবে আহিরিটোলার ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় লিখলেন ‘কিছু কিছু বুঝি’। অমৃতলালকে বন্ধুরা ধরেছে কয়লাঘাটায় গিয়ে ‘কিছু কিছু বুঝি’-র মঞ্চায়ন দেখে আসতে। থিয়েটার রাতে হয়— দেখতে গেলে বাড়িতে ‘গোল পাকবে’ বলে বন্ধুদের সঙ্গে দিনের বেলা স্টেজ দেখতে গেলেন অমৃতলাল। জিজ্ঞাসা করে জানলেন, অভিনেতাদের মধ্যে আছেন ধর্মদাস এবং অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি। এই সুত্রপাত। ক্রমশ নটবর চৌধুরীর বাড়িতে অর্ধেন্দুর ঘনঘন আগমন। এরই মধ্যে গিরিশবাবুর বাগবাজারের বাড়ি গিয়ে অমৃতলাল শুনে এসেছেন সেক্ষপীয়র আবৃত্তি— অমৃতলালের কথায় ‘the grand voice’।   

বাংলা নাটকের পরিচিত রচনা 'নীল দর্পণ'-এর প্রচ্ছদ, যেখানে একটি পুরনো ছবির সঙ্গে সাদা এবং হলুদ রংয়ের প্রাবন্ধিক লেখা রয়েছে।

     এইসব নানান চাপান উতরের মধ্যেই ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর, পেশাদারী রঙ্গালয়ের গোড়াপত্তন। নাটক ‘নীল দর্পণ’। নাটক রচয়িতা দীনবন্ধু মিত্র। অভিনয় চলাকালীন গ্যাস ফুরিয়ে বাতি নিভে গেল। দর্শকরা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে অভিনয় দেখলেন। ৭০০ টাকারও বেশি টিকিট বিক্রি হল। এই প্রযোজনায় অমৃতলাল স্ত্রী-চরিত্র সৈরেন্ধ্রির ভূমিকায় অভিনয় করলেন। এর পর তো সেই গান বাঁধলেন গিরিশচন্দ্র, যে গান অনুসরণ করলে সেই অভিনয়ের কুশীলবদের কথা বোঝা যায়। নগেন্দ্রনাথ, অর্ধেন্দুশেখর, ধর্মদাস, মতিলাল সুর, ক্ষেত্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, বেণীমাধব মিত্র, ব্রাহ্ম সমাজের গায়ক বিষ্ণু, অবিনাশচন্দ্র কর, শশীদাস দাস এবং অমৃতলাল বসু। গানটি যদিও ব্যাঙ্গ করে লিখেছিলেন গিরিশচন্দ্র, অমৃতলাল কিন্তু সেই গানই মহলার সময় গেয়ে উঠে সকলকে অবাক করলেন।

     এর পর ১৮৭৬। ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার বড় ছেলে প্রিন্স অফ ওয়েলস্‌, যিনি পরে সপ্তম এডওয়ার্ড নামে খ্যাত হবেন, সেই বার্টি এলেন ভারতে। শ্রীলঙ্কা মাদ্রাজ হয়ে কলকাতায় এসেই জানিয়ে দিলেন, বাঙালি হিন্দু পরিবারের মহিলা মহলে গিয়ে মহিলাদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করবেন। হাই কোর্টের উকিল তথা সরকারি কমিটির সদস্য জগদানন্দ মুখোপাধ্যায় ভবানিপুরের নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন বার্টিকে। উপেন্দ্রনাথ দাস, যাঁর কথা আগেই বলা হয়েছে, তিনি লিখে ফেললেন প্রহসন ‘গজদানন্দ ও যুবরাজ’। ১৮৭৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, গ্রেট ন্যাশনাল-এ অভিনীত হল এই নাটক, সঙ্গে আরও কয়েকটি। একই বছর, ১ মার্চ, উপেন্দ্রনাথের ‘সুরেন্দ্র বিনোদিনী’, শেষে বেনামী প্রহসন ‘The Price of Pig’। এই দ্বিতীয়টির লেখক কে? উপেন্দ্রনাথ না অমৃতলাল? পুলিশ কমিশনার ও কর্পোরেশনের প্রধান স্টুয়ার্ট হগ এবং পুলিশ সুপার ল্যাম্ব বিরাট পুলিশ বাহিনী নিয়ে বিডন স্ট্রিট ঘিরে ফেললেন। বুঝতেই পারছেন— Dramatic Performance Act, 1876। গ্রেফতার হলেন উপেন্দ্রনাথ দাস, অমৃতলাল বসু, অমৃতলাল মুখোপাধ্যায়, মতিলাল সুর প্রমুখ দশজন। পুলিশ কোর্টে ৮ মার্চ জামিন পেলেন আটজন। কারাদণ্ড হল অমৃতলাল বসু ও উপেন্দ্রনাথ দাসের। এর পর কলকাতা হাই কোর্টে দুই অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়ালেন Indian Mirror পত্রিকার অন্যতম প্রধান মনমোহন ঘোষ ও বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার তারকনাথ পালিত। মনে রাখতে হবে, দুই প্রধান অভিযুক্তকে অশ্লীলতার দায়ে জেলে ভরা হয়েছিল। সাধারণ রঙ্গালয়ের পথচলা শুরু ১৮৭২ সালের শেষের দিকে। আর ১৮৭৬-এর গোড়াতেই নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন প্রয়োগ করে গ্রেফতার করা হল উপেন্দ্রনাথ ও অমৃতলাল বসুকে। তিন বছরেরও কম সময়ে বাংলা রঙ্গমঞ্চ এদেশে ব্রিটিশ শাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো। তার মোকাবিলা করতে প্রয়োগ করা হল অশ্লীলতার অভিযোগ। তবে উচ্চ আদালত অমৃতলাল বসু এবং উপেন্দ্রনাথ দাসকে বেকসুর খালাষ দিল। উপেন্দ্রনাথ গেলেন বিলেতে আইন পড়তে। অমৃতলাল রেগেমেগে চেপে বসলেন পোর্ট ব্লেয়ার-গামী জাহাজে।

বিবাহ-বিব্রাট নাটকের পাণ্ডুলিপি, যা দুটি অঙ্গে বিভক্ত।

   পরবর্তীকালেও অমৃতলাল এই শ্লীল-অশ্লীল বিষয়টিকে ব্যবহার করলেন তাঁর প্রহসনের অস্ত্র হিসেবে। ‘ব্যাপিকা বিদায়’ নাটকে তরুণ পুষ্পবরণ রায় ও তার নববিবাহিতা স্ত্রী মিনি রায় কথা বলেন পুতুল-পুজো নিয়ে। এর পর মিনি রায় গান গাইছেন – ‘ও গো পা যে বাড়ালে/ পা যে বাড়ালে!/ তবে যেতে যেতে কেন দাঁড়ালে/ কেন দাঁড়ালে?’ এবার হাঁচি টিকটিকি প্রভৃতি কুসংস্কারর কথা। সেই সঙ্গে পোয়েট্রি। তার পরেই, ঘরের ভেতরে elope করার কথা। তা কেন? কারণ ‘they want to have so sweet a kiss such as this’। মিনি রায় বলে— কেমন, কেমন? আবার বলো।’ পুষ্পবরণ ফের এগিয়ে যায়, বলে— ‘Come, come, such as this’। এর পরে আলিঙ্গন, চুম্বন প্রভৃতি। যেহেতু বিষয়টা ইংরেজিতে, অতএব ভিন-দেশীয় সংস্কৃতিকে নিয়ে মজা করার ছলে সবই ঘটে যায়। বাস্তবে ফিরে আসে যখন উড়িয়া রান্নার পাচক শোনে, মিনি মেমসাহেবের মা আসছেন। মিনি যেহেতু গৃহলক্ষ্মী, পুরাণ অনুসারে তার মা থাকেন সমুদ্র গভীরে। সেই জন্য উড়িয়া পাচক ঝড়-তুফান, হাঙর-কুমীর ইত্যাদি ভয়ের কথা বলে।

   ইওরোপীয় নাটকে প্রশিক্ষিত অমৃতলাল প্রয়োগ করেন dramatic irony। কারণ পুষ্পবরণের শাশুড়ি আসার পর সত্যিই ঝড়-তুফান হয়। এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে আসবে সবিতাব্রত দত্ত পরিচালিত ‘রূপকার’ (১৯৫৫) দলের ‘ব্যাপিকা বিদায়’ প্রযোজনার কথা, যেটি শততম রজনী পার করে কলকাতায় মঞ্চস্থ হয়েছে।

   রসরাজ অমৃতলালের বলা শ্লীল-অশ্লীল প্রসঙ্গে ছোট্ট একটি কথিকা দিয়ে শেষ করি এই অকিঞ্চিৎকর প্রতিবেদন।

   অনেকেরই মনে থাকবে, ১৮৭৩ সাল নাগাদ বিডন স্ট্রিটের বেঙ্গল থিয়েটারে গোলাপ এলোকেশী, শ্যামা সুন্দরী ও জগতারিণী – এই চার বারাঙ্গনা নারী চরিত্রে অভিনয় করতে আসেন। এর আগে পুরুষরাই অভিনয় করতেন স্ত্রী-চরিত্রে। এক নাটকের মহলায় উপস্থিত রয়েছেন ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এক সাহেব। নাটকে বর্ণনা আছে, ‘নায়ক-নায়িকা দুজনে প্রগাঢ় চুম্বন করচে।’ অমৃতলাল সাহেবকে জিগেস করলেন, মঞ্চে দৃশ্যটি কেমন হওয়া উচিত। সাহেব জানালেন, তাঁদের দেশে সাধারণত মঞ্চে চুম্বনের দৃশ্য হয়ে থাকে। অকস্মাৎ সাহেবের মনে পড়ল, এখানে তো স্ত্রী-চরিত্রেও পুরুষরা। অতএব যা ঘটবে, তা দুই পুরুষের চুম্বন। অশ্লীলতার ভয়ে তৎক্ষণাৎ দৃশ্যটি ছেঁটে ফেলার পরামর্শ দিলেন অমৃতলালকে। সহাস্য অমৃতলালের উক্তি, স্ত্রী-চরিত্রে তাঁরই করার কথা। আমরা ভাবি, ইওরোপীয়দের কাছে আমরা মঞ্চমায়ার শিক্ষা গ্রহণ করেছি। আবার সেই সঙ্গে শ্লীল-অশ্লীলতার বিশেষ মাত্রা Victorian ghost আমাদের ঘাড়ে আজও সওয়ার।     

গ্রন্থ সহায়:

১) ‘পুরাতন প্রসঙ্গ ও বিচিত্র প্রসঙ্গ’, বিপিনবিহারী গুপ্ত, সম্পা: প্রসাদ সেনগুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং

২) ‘অদামৃতকথা’, ব্রাত্য বসু, আনন্দ

৩) ‘স্মৃতি ও আত্মস্মৃতি’, অমৃতলাল বসু, সম্পা: অরুণকুমার মিত্র, সাহিত্যলোক

8) ‘উনিশের কলকাতা : অমৃতের কথকতা’, সম্পা: ইন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, সিসৃক্ষা

৫) সংসদ বাংলা নাট্য অভিধান, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, সাহিত্য সংসদ    

Author

  • পড়েছেন তুলনামূলক সাহিত্য। বাদল সরকার এবং গিরিশ কারনাডকে নিয়ে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। দৃশ্য ফিল্ম কালেক্টিভ ও পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য। কাজ করেছেন কলকাতা পৌর সংস্থার মুখপত্র ‘কলকাতা পুরশ্রী’ সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইন্সটিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ-এর প্রাক্তন প্রজেক্ট ফেলো।


Discover more from Tramlineweb

Subscribe to get the latest posts sent to your email.